গণ-অভ্যুত্থানের সেই জুলাই: মুন্সীগঞ্জ হারায় ১৬ সন্তানকে
নিজস্ব প্রতিনিধি-
আজ ঐতিহাসিক *জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস*। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রায় ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। দেশ ছেড়ে চলে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সারাদেশে সরকারি সাধারণ ছুটি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে দিনটি। জাতীয়ভাবে বিশদ কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম+এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে বীর জুলাইযোদ্ধা ও শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জের শোকগাথা: প্রাণ দেন ১৬ জন-
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে মুন্সীগঞ্জের ১৬ জন বাসিন্দা প্রাণ দিয়েছেন । এর মধ্যে ১৩ জন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এবং ৩ জন ৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের প্রতিরোধের মুখে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
সংশ্লিষ্ট থানা, সিভিল সার্জন কার্যালয়, পরিবার ও গণমাধ্যমের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৬ জন শিক্ষার্থী, ৪ জন দিনমজুর শ্রমিক, ৩ জন বেসরকারি চাকুরিজীবি, ১ জন প্রবাসী ও ২ জন ব্যবসায়ী। সবারই বুক ও মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লেগেছিল।
*যারা প্রাণ দিলেন*৪ আগস্ট, মুন্সীগঞ্জ সুপারমার্কেট:
গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন উত্তর ইসলামপুর এলাকার ৩ শ্রমিক –
1. *সজল মোল্লা (৩১)* – পিতা: আলী আকবর মোল্লা
2. *রিয়াজুল ফরাজী (৩৮)* – পিতা: মতিন ফরাজী
3. *নুর মোহাম্মদ ওরফে ডিপজল (২২)* – পিতা: সিরাজ সরদার
গুলি-হামলার মুখে বুক পেতে দাঁড়ানো সজল মোল্লার আত্মত্যাগ আজও চোখ ভেজায়।
*৫ আগস্ট, সরকার পতনের দিন:*
1. *আশরাফুল ইসলাম অন্তর (১৬)* – সদর উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বানিয়াল আসেরচর। ডেমরা সিদ্দিক আকবর ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী। যাত্রাবাড়িতে বুকে গুলিবিদ্ধ।
2. *শারিক চৌধুরী মানিক (২৯)* – মিরকাদিম পৌরসভার রামগোপালপুর। পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব। সরকার পতনের মাত্র ২ ঘণ্টা আগে চানখারপুলে মাথায় গুলিবিদ্ধ।
3. *মো. আক্কাস আলী (৪)* – শ্রীনগরের শ্যামসিদ্ধি ইউনিয়নের সেলামতি গ্রাম। যাত্রাবাড়িতে বুকে গুলিবিদ্ধ।
*জুলাইয়ের অন্যান্য দিনগুলোতে ঢাকায় নিহতরা:*
– *১৮ জুলাই, যাত্রাবাড়ি:* মো. সোহেল রানা (৩৭), লৌহজংয়ের ঘোড়দৌড়। কাপড় ব্যবসায়ী।
– *১৯ জুলাই, কদমতলী:* মো. মাহাদী হাসান প্রান্ত (১৮), লৌহজংয়ের কুমারভোগ। তোলারাম কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী।
– *১৯ জুলাই, রামপুরা:* মোস্তফা জামান সমুদ্র (১৭), সিরাজদিখানের মধ্যপাড়া। এসএসসি পরীক্ষার্থী।
– *১৯ জুলাই, নিউমার্কেট:* সাইদুল ইসলাম শোভন (১৯), শ্রীনগরের কোলাপাড়া। অনার্স ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী।
– *১৯ জুলাই, উত্তরা:* আল-আমিন খলিফা (১৮), শ্রীনগরের নতুন মত্তগ্রাম। অভিনেত্রী তানজিন তিশার সাবেক সহকারি।
– *১৯ জুলাই, আফতাবনগর:* মো. রাকিব হোসেন (২১), লৌহজংয়ের কুমারভোগ।
– *২০ জুলাই, সাইনবোর্ড:* মেহেদি হাসান (২০), গজারিয়ার বালুয়াকান্দি। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী।
– *২১ জুলাই, কদমতলী:* মুজিবুর রহমান সরকার (৫), গজারিয়ার ইমামপুর। সৌদি প্রবাসী। নামাজ পড়তে গিয়ে গুলিবিদ্ধ।
– *২৮ জুলাই, রামপুরা:* মো. বাবুল হাওলাদার (৫২), লৌহজংয়ের গাওদিয়া। দিনমজুর।
– *৪ আগস্ট, যাত্রাবাড়ি:* মো. ফরিদ শেখ (২৯), সদরের রামপাল ইউনিয়নের সুখবাসপুর। ব্যবসায়ী।
সংখ্যাটা ১৬-ই যে চূড়ান্ত তা নয়। আরও নাম অজানা থেকে যেতে পারে। কিন্তু প্রতিটি নামের পেছনে আছে একটি পরিবারের অপূরণীয় শূন্যতা, একটি স্বপ্নের অকাল সমাপ্তি।আজকের দিনে আমরা শুধু শোক নয়, তাদের আত্মত্যাগের ঋণও স্মরণ করি।
Leave a Reply